ঢাকা, রবিবার ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

একজন সাহসী শুদ্ধাচারী মানুষ অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শিবলী ভাই (১৯৫৫-২০১৪) এর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

 নিউজ রুমঃ Bijoy Bangla BD 24. COM

 প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০১৯, ১১:০০

৭৫ বার পঠিত

পাবনার ইতিহাস, ঐতিহ্য-অনুসন্ধিৎসু ও সারস্বত অঙ্গনের নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শিবলী ভাই। তাঁর ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্রবোধ এত প্রখর ছিল অনেক লোকের মধ্যে থাকলেও অনুভব করা যেত তিনি তাঁর অস্তিত্বের চারপাশে খানিকটা দূরত্ব সৃষ্টি করে নিয়েছেন। একটা শুদ্ধতা তাঁকে সব সময় ঘিরে থাকত। পাবনার ঐতিহ্য বিলিন হতে দেখলে তিনি দারুণভাবে ব্যথিত হতেন। এই সকল ঐতিহ্য বিনাশকারীদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লিখতেন। কেউ কোনো বিষয়ে লিখতে চাইলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। উৎসাহিত করতেন নতুন লেখকদের। তাঁর কাছে অনবরত নানা শ্রেণিপেশার মানুষ যাতায়াত করতেন। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, পণ্ডিত, পাদ্রী অনেকেই। তাঁকে দেখলেই আমার একটা অনাবিল, নিষ্কাম আনন্দের সৃষ্টি হত। পাবনাতে গেলেই মোক্তার বারের তাঁর চেম্বারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাবনার নানা বিষয় নিয়ে আলাপ হত। সেই আনন্দের, ভালোবাসার উৎসটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল ! আমি যুগ যুগ অপেক্ষা করেও তাঁর সাক্ষাৎ পাব না ! শ ই শিবলী ভাই বিহনে পাবনা আমার জন্য অনেকখানি সৌন্দর্যহীন ধূসর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। শিবলী ভাই নাই, তাই আর মোক্তার বারে একটি বারের জন্যও যাওয়া হয় না আমার। যেতে পারি না আমি।আজ ২৬ অক্টোবর। ২০১৪ সালের আজকের এই দিনে ঢাকার ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালে শিবলী ভাই মৃত্যুবরণ করেন। ২৭ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে তাঁকে পাবনার আরিফপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শিবলী ১৯৫৫ সালের ৩০ অক্টোবর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ মুনশি মনির উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার কাওয়াক গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও কাওয়াকের সম্পন্ন শিক্ষিত পরিবার। মনির উদ্দিন আহম্মদ ফারসি, আরবি ও বাংলা ভাষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন; তিনি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চিকিৎসক ও লোক-কবি ছিলেন; তাঁর লেখা গজল ও গীতিমালা সে সময় খুব খ্যাতি অর্জন করে। পিতা এম রজব আলী (১৮৯৯-১৯৬৮) পাবনা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। এম রজব আলী ছিলেন পাবনা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান (১৯৫২-৫৪), লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী (১৯৩৪-৬৮), ইসলামি সমাজ সংস্কারক ও দক্ষ সংগঠক। শ ই শিবলীর মা হাফিজা খাতুন (১৯২৪-১৯৭৭)। ছয় ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে শ ই শিবলী অষ্টম।পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার মোখতার পাড়ায় কেটেছে তাঁর শৈশব। সঙ্গত কারণেই ভর্তি হন মহিমচন্দ্র জুবিলী হাই স্কুলে। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন শ ই শিবলীর পিতা ইন্তেকাল করেন। ১৯৭০ সালে এই বিদ্যালয় থেকেই মানবিক শাখায় প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পারিবারিক প্রয়োজনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজে ভর্তি হলেও ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে পাবনায় ফিরে ভর্তি হন তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ)। ১৯৭২ সালে এ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলেজের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ও প্রকাশনায় গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন। অনেকটা সাহিত্য-সংস্কৃতির টানে ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের স্নাতক (সম্মান) কোর্সে, বাংলা বিভাগে। ১৯৭৫ সালের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। কলেজের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সপ্তাহে ‘বিজয়ী শ্রেষ্ঠ’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি মৌখিক শেষ হবার তিন দিন পরে তাঁর মা ইন্তেকাল করেন।অনার্স কোর্সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৭৬ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন তিনি। সাহিত্যচর্চা ও লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। উভয় বাংলায় প্রতিশ্রুতিশীল কবি হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হতে থাকে। ইতোমধ্যে ১৯৭৮ সালে পাবনায় সংগঠন করেন- কবিকণ্ঠ : সাপ্তাহিক কবিতা পাঠের আসর।

১৯৮১ সালের ৩০ এপ্রিল শফিকুল ইসলাম শিবলীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সাপ্তাহিক বিবৃতি’। যা আজ দৈনিকে রূপান্তরিত। ইতোমধ্যে রাজশাহী আইন কলেজ থেকে আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করেন ও পাবনায় আইন পেশায় নিয়োজিত হন। অসহায় দুস্থ মানুষদের আইনগত সহায়তা দান করেছেন আমৃত্যু।
পাবনা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদে একাধিকবার নির্বাচিত হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মূলত তাঁরই উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ২০০০, ২০০৩ ও ২০০৭ সালে পাবনা বারের বার্ষিকী। প্রধান রচনাসমূহ ছাড়াও সম্পাদক পরিষদে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আইন-আদালত সম্পর্কিত পাবনা বারের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও চলমান ঘটনাপ্রবাহে বার সদস্যদের ভূমিকা পালনের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ বার্ষিকীগুলো সুশীল সমাজের প্রশংসা লাভে সমর্থ হয়।জাতীয় গ্রন্থবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে ২০০২ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, পাবনা শাখা থেকে প্রকাশিত ‘পাবনা জেলা’ বিষয়ক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনায় সম্পাদনা-সহকারী প্যানেলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ তাঁর সম্পাদনায় পাবনা শহর থেকে প্রকাশিত হয় ‘সাপ্তাহিক আরশী’ গ্রহণযোগ্যতায় ও তথ্য পরিবেশনায় আজো পত্রিকাটি বিশ্বাসযোগ্যতায় অদ্বিতীয়।
বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ-কল্যাণ সমিতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন তিনি। পাবনা প্রেসক্লাবের নির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ, সহ-সভাপতি, নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি । পাবনা রিপোর্টার্স ইউনিট-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। বহুমাত্রিক প্রতিভার মেলবন্ধনে পাবনা’র তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা।সাহিত্যপ্রেমী, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের ভালবাসতেন, উৎসাহ দিতেন । জীবনে জীবন যোগ করে নিজেকে “সকলের” করে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। পাবনার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই চরিত্রগুণ নিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। মার্জিত রুচি, স্মিতহাস্য-আলাপে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পাবনা শহরবাসীর স্বজন এবং সৃজনশীলতায় স্বতন্ত্র বিরল প্রতিভার অধিকারী।আজকে এই বরেণ্য ব্যক্তির পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে আল্লাহ্ তায়ালার কাছে বিনীত প্রার্থনা করি, তুমি আমাদের সকলের প্রিয় শফিকুল ইসলাম শিবলী ভাইকে জান্নাতবাসী করো। আমিন।

সর্বশেষ
আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত

Copyright ©  BijoyBanglaBD24.com                                 Developed by VIP TECHNOLOGY